হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) ইসলামের শেষ নবী ও রাসুল হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিত। তিনি ৫৭০ খ্রিস্টাব্দে মক্কা নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম ছিল আবদুল্লাহ এবং মায়ের নাম আমিনা। খুব অল্প বয়সে তিনি পিতৃমাতৃহীন হন এবং তার দাদা আবদুল মুত্তালিব ও পরে চাচা আবু তালিবের তত্ত্বাবধানে বেড়ে ওঠেন।
মুহাম্মদ (সাঃ) তাঁর সততা, বিশ্বাসযোগ্যতা এবং ন্যায়নিষ্ঠা জন্য পরিচিত ছিলেন এবং মক্কাবাসীরা তাঁকে "আল-আমিন" বা "বিশ্বাসী" বলে ডাকত। ৪০ বছর বয়সে হেরা গুহায় ধ্যান করার সময় তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রথম ওহী লাভ করেন, যা ইসলামের নবুয়তের সূচনা করে। এই ওহীর মাধ্যমে তিনি ইসলামের মর্মবাণী প্রচার শুরু করেন এবং মক্কার মানুষেরা ধীরে ধীরে ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় নিতে শুরু করে।
তাঁর জীবনের প্রধান ঘটনাগুলোর মধ্যে রয়েছে মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত, বদর ও ওহুদ যুদ্ধ, এবং মক্কা বিজয়। মুহাম্মদ (সাঃ) আল্লাহর প্রদত্ত নির্দেশনার আলোকে সমাজে শান্তি, ন্যায় ও সাম্যের বার্তা প্রচার করেন। তাঁর নেতৃত্বে ইসলাম ধর্ম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়, যা মানুষের জীবনের সব ক্ষেত্রে সুষ্ঠু দিকনির্দেশনা প্রদান করে।
৬৩ বছর বয়সে, ৬৩২ খ্রিস্টাব্দে, হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) ইন্তেকাল করেন। তাঁর জীবনের শেষ ভাষণ, বিদায় হজ্জের খুৎবা, মানবজাতির জন্য এক চিরন্তন দিকনির্দেশনা হিসেবে বিবেচিত হয়। তাঁর শিক্ষা ও জীবনাচার অনুসরণ করে পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ আজও ইসলামের পথে পরিচালিত হচ্ছে।
"রবী‘আ ইব্ন নাসরের ভয়ংকর স্বপ্ন এবং সাতীহ ও শিকের রহস্যময় ভবিষ্যদ্বাণী: ইয়ামেনের ইতিহাসের এক অনন্য কাহিনী"
সূত্র : সীরাত ইবনে হিসাম. সম্পুর্ন বইটি কিনতে.........সীরাত ইবনে হিসাম
ইব্ন ইসহাক বলেন : (রোম সম্রাটের) অধীনতা স্বীকারকারী রাজাদের
মধ্যে ইয়ামেনের রাজা রবী‘আ ইব্ন নাসর ছিলেন একজন দুর্বল রাজা। তিনি একটা ভয়ংকর একটা
দুঃস্বপ্ন দেখে ভীত ও চিন্তিত হয়ে পড়েন। দেশের সকল জ্যোতিষী, যাদুকর প্রভৃতিকে ডেকে
বললেন : আমি একটা ভয়ংকর দুঃস্বপ্ন দেখে ভীত হয়ে পড়েছি। আমি কি দেখেছি এবং তার তাৎপর্য
কি, তা তোমরা বলো। তারা তাকে বললো : আপনি স্বপ্নটা আমাদের বলুন। আমরা তার ব্যাখ্যা
বলবো। রাজা বললেন : আমি যদি স্বপ্নের বৃত্তান্ত বলে দেই, তা হলে তোমাদের ব্যাখ্যায়
আমি সন্তুষ্ট হতে পারবো না। কেননা এ স্বপ্নের ব্যাখ্যা দিতে পারবে শুধু সেই ব্যক্তি,
যে আমার বলার আগেই আমার স্বপ্নটাও জেনে নিতে পারবে। তখন তাদের মধ্য থেকে এক ব্যাক্তি
বললো : জাহাঁপনা যদি এটাই চান, তাহলে “সাতীহ” ও শিক কে ডাকুন। কেননা স্বপ্নের ব্যাপারে
তাদের চেয়ে অভিজ্ঞ কেউ নেই। তারাই আপনার প্রশ্নের জবাব দিতে পারবে।
সাতীহের পরিচয়
সাতীহ নামক এই লোকটির শুধু ধড় ছিল। অংগ-প্রত্যংগ ছিল না।
সে বসতেও পারত না। তবে রাগ হলে শরীরটা ফুলে উঠত। তখন বসতে পারত। কথিত আছে যে, তার মুখ
ছিল বুকে, তার কোন মাথা ও ঘাড় ছিল না। ওহাব ইব্ন মুনাব্বিহ্ বলেন, সাতীহকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, তুমি কোথা থেকে এ জ্ঞান লাভ
করেছ ? সে বলত, আমার এক জিন বন্ধু আছে। যখন আল্লাহ্ তূর পাহাড়ে মূসার সংগে কথা বলেছিলেন,
তখন সে সেই কথোপকথন শুনেছিল এবং যা কিছু জানতে
পেরেছিল, তাই আমাকে জানিয়েছে।
শিকের পরিচয়
শিক অর্থ অংশ। এরূপ নামকরণের
কারণ এই যে, সে আসলে আধা মানব ছিল। তার হাত একখানা ,পা একখানা ও চোখ একটি ছিল। আমর
ইব্ন আমিরের স্ত্রী হিময়ারী বংশোদ্ভূত খ্যাতনাম্নী ও জ্যোতিষী তারীফা বিনতে খায়ের যেদিন মারা যায়, শিখ ও সাতীহ সেই দিন জন্মগ্রহন করে। তারীফা
শিখ ও সাতীহকে তার মৃত্যুর পূর্বে তার কাছে উপস্থিত করার নির্দেশ দেয়। তাদের উপস্থিত
করার পর সে তাদের মুখে থু-থু দিয়ে বলে, এরা দু‘জন আমার জ্যোতির্বিদ্যার উত্তরাধিকারী
হবে।
আরও পড়ুন.........নারী স্বাধীনতা, নারীবাদ,,,,,,কোটা সংস্কার আন্দোলন: মেধার মূল্যায়ন ও সামাজিক ন্যায়বিচারের লড়াই
স্বপ্নের ব্যাখ্যা
ইব্ন ইসহাক বলেন : তারপর রাজা শিখ ও সাতীহকে ডেকে পাঠালেন। শিকের আগে সাতীহ উপস্থিত হলো। তখন
রাজা তাকে বলল, ওহে সাতীহ ! আমি একটা ভয়ংকর স্বপ্ন দেখেছি। কি দেখেছি বল তো
? তুমি যদি স্বপ্নটা বলতে পার, তা হলে তার সঠিক ব্যাখ্যাও দিতে পারবে। সাতীহ বলল ঠিক আছে। বলছি শুনুন আপনি স্বপ্নে দেখেছেন অন্ধকারের
ভেতর থেকে একটা জ্বলন্ত অংগার বেরিয়ে এসে নিম্নভূমিতে নামল এবং সেখানে যত প্রানী ছিল,
সবাইকে গ্রাস করল। রাজা বললেন বাহ্ ! হে সাতীহ ! স্বপ্নটা তো তুমি সঠিকভাবেই বলে দিয়েছ।
এখন বলতো এর ব্যাখ্যা কি ?
সে বলল: দুই প্রস্তরময় দেশে যত সাপ আছে তার শপথ ! আবিসিনিয়াবাসী
আপনার ভূ-খন্ডে ঢুকে পড়বে এবং আবয়ান থেকে জুরাশ পর্যন্ত সমগ্র ভূখন্ড দখল করে নেবে।
রাজা বললেন: হে সাতীহ ! তোমার পিতার শপথ ! এটা তো খুবই বেদনাদায়ক
ও ক্রোধোদ্দীপক ব্যাপার। এটা কবে ঘটবে ? আমার আমলেই, না আমার পরে ? সে বলল: আপনার আমলের
কিছু পরে। ষাট বা সত্তর বছর পর। রাজা জিজ্ঞেস করলেন: এই ভূখন্ড কি চিরকালই তাদের অধিকারে
থাকবে, না তাদের জবরদখলের অবসান ঘটবে ? সে বলল: সত্তর বছরের কিছু বেশিকাল উত্তীর্ন
হবার পর তাদের দখলের অবসান ঘটবে। তারপর তারা হয় নিহত হবে, নয়তো পালিয়ে যাবে। রাজা পুনরায়
জিজ্ঞেস করলেন: কে তাদেরকে হত্যা ও বহিস্কার করবে ? সাতীহ বলল: তারা নিহত ও বহিস্কৃত
হবে ইরাম ইব্ন যী ইয়াযানের হাতে। তিনি এডেন থেকে আবির্ভূত হবেন এবং ইয়ামেনে তাদের একজনকেও
অবশিষ্ট রাখবেন না। রাজা বললেন: ইরামের আধিপত্য কি চিরস্থায়ী হবে না ক্ষনস্থায়ী ?
সাতীহ বলল: তার আধিপত্য অস্থায়ী হবে।
রাজা বললেন: কার হাতে ক্ষমতার অবসান ঘটবে ?
সাতীহ বলল: এক পূত-পবিত্র নবীর হাতে। তিনি উর্ধ্ব জগত থেকে
ওহী লাভ করবেন।
রাজা বললেন: এ নবী কোন্ বংশোদভূত ?
সাতীহ বলল: গালিব ইব্ন ফিহর ইব্ন মালিক ইব্ন নযর এর বংশধর
হবেন। তাঁর জাতির হাতে ক্ষমতা থাকবে সৃষ্টিজগত ধ্বংস হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত।
রাজা বললেন: সৃষ্টিজগতের আবার শেষ আছে নাকি ?
সে বলল: হ্যাঁ, যেদিন পৃথিবীর প্রথম ও শেষ মানুষ সকল একত্রিত
হবে। যারা সৎকর্মশীল তারা সুখি হবে, আর যারা অসৎ কর্মশীল তারা দুঃখ ভোগ করভব।
রাজা বললেন: তোমার ভবিষ্যৎ বাণী কি সত্য ?
সে বলল: হ্যাঁ, রাতের আধার, ঊষার আলো ও সুবিন্যস্ত প্রভাত
সাক্ষী. আমি তোমাকে যা বলেছি তা সত্য।
আরও পড়ুন.......বই : বেলা ফুরাবার আগে
এরপর রাজার দরবারে এল শিক। রাজা সাতীহকে যা যা বলেছিলেন, শিককেও তাই বললেন। কিন্তু সাতীহ রাজাকে যা যা বলেছিলেন, তা তিনি শিককে জানতে দিলেন না। কেননা তিনি দেখতে চাইছিলেন, তাদের উভয়ের বক্তব্য এক রকম হয়, না ভিন্ন ভিন্ন রকমের।
শিক বলল: আপনি স্বপ্নে দেখেছেন, অন্ধকার থেকে একটি জ্বলন্ত
অংগার বেরিয়ে এসে একটি পর্বত ও একটি বাগানের মাঝখানে পড়ল। এরপর তা সেখানকার সকল প্রানীকে
গ্রাস করল।
যখন শিক এরুপ বলল, তখন রাজা বুঝতে পারলেন যে, উভয়ে স্বপ্নের
একই রকমের বিবরন দিয়েছে। পার্থক্য কেবল এই যে, সাতীহ বলেছিল: জ্বলন্ত অংগারটি নিম্নভূমিতে
পড়ল। আর শিক বলেছে: একটি পর্বত ও একটি বাগানের মাঝখানে পড়ল। তারপর তিনি শিককে বললেন:
তুমি ঠিকই বলেছ। এখন বল এ স্বপ্নের তাৎপর্য কি ?
সে বলল: দুই পর্বতময় দেশের সমস্ত মানুষের শপথ করে বলছি, আপনার
দেশে সুদানীরা আক্রমন চালাবে। সকল দুর্বল লোক তাদের আংগুলি হেলনে চলতে বাধ্য হবে এবং
আবয়ান থেকে নাজরান পর্যন্ত সমগ্র এলাকা তাদের দখলে চলে যাবে।
রাজা বললেন: ওহে শিক ! তোমার পিতার শপথ ! এটা তো খুবই মর্মন্তুদ
ও ক্রোধোদ্দীপক ব্যাপার। এটা কবে ঘটবে ? আমার জীবদ্দশাতেই, না আরো পরে ? সে বলল: আপনার
আমলের বেশ কিছুকাল পরে। এরপর একজন পরাক্রমশালী ব্যাক্তি আপনাদের লোকদের হানাদারদের
কবল থেকে মুক্ত করবে এবং তাদের ভীষনভাবে পর্যুদস্ত ও লাঞ্ছিত করবে।
রাজা বললেন: এই পরাক্রমশালী ব্যাক্তিটি কে ?
সে বলল: একজন তরুন, যিনি নগন্য ও দুর্বলচিত্ত নন। যী ইয়াযানের
বংশ থেকে তার আবির্ভাব ঘটবে। তিনি হানাদারদের একজনকেও ইয়ামেনে টিকতে দিবেন না।
রাজা বললেন: এই ব্যাক্তির আধিপত্য কি চিরস্থায়ী হবে, না ক্ষনস্থায়ী
?
শিক বলল: একজন প্রেরিত রাসুলের আগমনে তার শাসনের অবসান ঘটবে।
সেই রাসুল সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা করবেন। ধার্মিক ও সৎ লোকদের
সাথে আনবেন। তাঁর জাতির আধিপত্য কিয়ামত পর্যন্ত বহাল থাকবে।
রাজা বললেন: কিয়ামত কি ?
সে বলল: সেদিন শাসকদের বিচার হবে, আকাশ থেকে এমন আহবান আসবে যা জীবিত ও মৃত সকলেই শুনতে পাবে। আর নির্দিষ্ট
সময়ে সকল মানুষকে সমেবত করা হবে। সেদিন সংযত লোকদের জন্য হবে সাফল্য ও কল্যাণ।
রাজা বললেন: তুমি যা বলছ,তা কি সত্য ?
সে বলল: হ্যাঁ, আকাশ ও পৃথিবী এবং তার মধ্যকার সকল সমতল ও
অসমতল স্থানের শপথ, আমি আপনার কাছে যা কিছু ভবিষ্যদ্বাণী করলাম, তা সম্পূর্ণ সত্য।
এরপর হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) পৃথিবীতে আগমন করে শিরক, অন্যায়, কুসংস্কার দূর করে শান্তির ধর্ম ইসলাম প্রতিষ্ঠা করলেন।
সূত্র : সীরাত ইবনে হিসাম
আমাদের সম্পর্কে...........


0 Comments